Friday, September 06, 2019

গরুময় ভারতে গোবরের গন্ধ ভাল লাগাতে শিখতে হবে



প্রথমে মনে হয়েছিল এসব ঐ মাড়োয়ারি সেবা সমিতির কাজ। খোঁজ নিয়ে জানলাম ওটা পশ্চিমবঙ্গের একটা  মফস্বল শহরে একটা স্থানীয় বাঙ্গালী ক্লাবের  কাজ। গণেশ চতুর্থী পালন।  বেশ একটা বাড়তি চাঁদা তোলা আর র্ফুতি করার অজুহাত তো পাওয়া গেল।  যে যার মত অজুহাত খুঁজে নিচ্ছে। কারুর দুগ্গা থেকে শুরু করে গণেশ, মা মনষা, মাই শনিও।   আবার অন্য় কারুর ইদ্, সবেবরাৎ, মহরম  থেকে শুরু করে কৃষ্ মাস আর গুড ফ্রাইডে তক্।

আগে বাঙ্গালীদের  "ভারতীয় হওয়াটা" ঐ দেওয়ালিতে কিছু পটকা ফাটানার মধ্য়েই সীমাবদ্ধ ছিল। বাড়ীতে মা দিদিরা প্রদীপ জ্বালাত।  সেসব অবশ্য় কালীপূজো উপলক্ষ্য় করেই হতো। কেউ কেউ তা টেনে টুনে দেওয়ালি পর্য্য়ন্ত নিয়ে যেত। তা বাঙ্গালির ভয়ঙ্কর সেই নরমুন্ডমালিনী, অর্দ্ধনগ্ন, সবকিছু তুচ্ছ করা মা কালী ভারতের গোবলয় আর দক্ষিনে ঠিক পাত্তা পেল না। ভারতের দক্ষিনে আর গোবলয়ে সব মেয়ে ভগবানকেই বেশ এরটা শান্ত, মমতাময় করে, অর্থাৎ বেশ গৃহপালিত করে তৈরী করা হলো। অনেক বেশি সামন্ততান্ত্রীক গোবলয়ে সাহস, শৌর্য, বীর্যের প্রতীক হয়ে উঠল বজরঙ্গবলী, অর্থাৎ লর্ড হানুমান। তাতে ওকানকার পুরুষকুলের সম্মান আর দাসত্বের মহত্ব দুটোকেই আরও মহিমান্বিত করা গেল। মা কালী প্রাধানত বাংলাতেই Lথাকল। সেটাও কিছু গরীব গূর্ব, চোর-ডাকাত, পুলিশ, আর কিছু দাপুটে বড়লোকের বাড়ীতেই থেকে গেল। ভারতে পুলিশের সঙ্গে ডাকাতের খুব একতা তফাৎ নাকি নেই। আর ঐ বড়লোকে, জোতদার, জমিদার গুলো  আগে প্রধানত ডাকাতই ছিল

ছোটতে যখন ওখানে বড় হয়েছিলাম তখন, আর তার পরেও এসব পশ্চিমবঙ্গের কোন মফস্বল শহরে তো নয়ই, বড় শহরেও মনে হয় খুব একটা গণেশ পুজো, ধনতেরাশ,  ছট্ পরব্, কড়োয়াচোত, পোঙ্গল, লাহোড়ি পালন হত না। এখন নাকি ওসব ঘটা করে পালন খুবই সাধারন ব্যাপার। কালোধনের (Black money) সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পটকার দাপটও বাড়ল। বাঙ্গালীরা নাকি ভারতীয় হতে লাগল।

পুরুতরাজ, জমিদারি, সতীদাহ সবই আস্তে আস্তে শুরু হবে মনে হচ্ছে। সঙ্গে রবি ঠাকুর, রামমোহন, বিদ্য়াসাগর, নেতাজি পুজোও। জাতপাত, শনি, মা মনসা, ধনতেরাশ, কড়োয়া চোত, ছট্ পরব্, Lord গ্যানেশ (আমাদের সময় উনি গণেশই ছিলেন), হাঁচি, টিকটিকি, astrology সবই তো রমরম করে চলছে মমতাময় বঙ্গে। আর তারথেকেও অনেক বেশি ঢাকঢোল পিটিয়ে গরুময় ভারতে। সঙ্গে কাঠ ছুঁয়ে  "touch wood" (আর অন্য় পশ্চিমি কুসংষ্কার), LOL, OMG, Swiss tour সবই একসঙ্গে দিব্য়ি চলছে।

ডান্ডিয়াটা গুজরাটেই চলে বেশি। মহারাষ্ট্রেও দাপট যথেষ্ট কারন ওখানের বড়লোক বা বাবু সম্প্রদায় অনেক বছর থেকেই গুজরাটি । দিল্লির মসনদেও  দাপট বেড়েছে। তা, চেহারার ধরন আর টাকার ওপর আফুরন্ত অকর্ষণ অনেকটা এক হলেও, লর্ড গ্যানেশ গুজরাটি কিনা, বা তার গুজ্জু জিন আছে কিনা, আর থাকলে সেটা এল কোথা থেকে- এগুলো ঠিক জানা যাচ্ছে না। গুজরাটে অবশ্য় ঐ জিন নিয়ে অনেকই সমস্য়া । আর তার পেছনে নাকি ডান্ডিয়া আর নবরাত্রির বেশ কিছু অবদানও আছে। তা ঐ  প্রশ্নগুলো নাকি politically correct নয়। Racism এর charge ও লাগিয়ে দেওয়া যেতে পারে। তার ওপর সামনে বিধানসভার ভোট আসছে মোল্লাময় বঙ্গে।

ঘরের কাছে সুন্দরবন বলে কিনা তা জানি না, তবে আগে "বাঘের বাচ্চা " বলতে বঙ্গ-সন্তান গর্ব বোধ করত।  বাঘ ভারতের অন্য় জায়গাতেও পাওয়া যায় আর "বাঘের বাচ্চা " বলতে গর্ব বোধ ওরাও করত।  এখনও পর্যন্ত বাঙ্গালী থাকা ঐ নরেন্দ্র নাথ দত্ত, ওরফে "ভিভেকানন্দ", গো মাংস খাওয়া সমর্থনই করেছিলেন। তা, গুজরাটী নরেন্দ্রনাথ এখন সবাইকে নিরামিশাষী করতে ব্যস্ত।  বেশ কিছু বছর হলো বাঘ যে কখন গরু হল আর পশ্চিমবঙ্গে কখন গো-বলয়ের অংশ হতে লাগল তা ঠিক বোঝা গেল না।  এখন  ওনার, অর্থাৎ লর্ড গ্যানেশের  অনারে ঐ  ডান্ডিয়া করতে হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গেও!  সাঁওতালি তো ছেড়ে দিলাম (উপজাতি, মানে বাংলায় বললে tribal তো- ঠিক সভ্য নয় কিনা), ঐ সর্বঘটে কাঁঠালিকলা ন্য়াকা ন্য়াকা, ধরা-ছাড়া রবীন্দ্র নেত্ত, বা ঐ কলকাতার ইস্পেশাল ধুনুচি নেত্ত মার্কা, বাঙ্গালী কিছু পছন্দ নয় নাকি তেনার? হিন্দি সিনেমায় তো বাপু তাইই করে- বাঙ্গালী বোঝাতে, সঙ্গে একটা "এ্যকলা চ্য়ালো ড়ে" গান, আর কিছু বেখাপ্পা অপ্রাসঙ্গিক শব্দ-  "রোশোগোল্লা",  "বাবুমোশাই", "আমি তোমাকে ভালোবাশি"  মার্কা।

মা দুগ্গার আর তার সব ছেলেপুলের ই একটা হিল্লে হল হল মনে হচ্ছে এই বাঁদররাজের উথ্থানে। মধ্যেখান থেকে লর্ড ক্যারটিক এর কপাল আর ভোগ দুইই মারা গেল। একটা খারাপ কথা বেড়িয়ে যাচ্ছিল একটু হলে (কোন রকমে সামলে নিলাম)! বেচারার ভাগ্য চিরকালই খারাপ। তা এই পদ্ম ফোটা ভারতেও ওর ভাগ্য ঠিক ফুটল না- অতভাল চেহারা, গায়কি, নৃত্য়, আর যুদ্ধ বিদ্য়ায়, মানে নাচে-গানে-ফাইটিং এ ভরপুর পারদর্শিতা সত্বেও!

ঐ একেবারে অপদার্থ লিপিস্টিক মাখা; জিন্স, sports-shoe পছন্দ করা; feminism, বাংরেজির (বাংলা যত কমবে তত নাকি ভালো), আর কলির জ্য়ান্ত কাত্তিক হার্তিক রোশনের ভক্ত ঐ মেয়েগুলোর লর্ড  ক্যারটিকের ভক্ত হওয়ার কথা ছিল! ওগুলোর সবথেকে বেশি ওয়াট্ লাগছে, মানে দুর্গতি হচ্ছে।  আরও অনেক বেশী হবে এই বাঁদর-রাজ বাড়তে থাকলে! ছেলেগুলো নাচাচ্ছে আর ওরাও দ্বিগুণ উৎসাহে আর শ’গুণ নির্বুদ্ধিতায় নেচে চলছে। ছেলে আর ঐ কপালে তিলক কাটা ভুরিমোটা লোকগুলোক সব মালপোয়া খেয়ে যাবে। ঐ লোকগুলো যেমন নাচাবে তেমন নাচবে। ঘরে, মন্দিরে, রাস্তা ঘাটে- সব জায়গায়। কিনা, ভগবান তুষ্ট হবে আর আর্যাবর্ত্য মহান দেশ হবে। বাঁদর, রাক্ষস, আর মেয়েগুলো ঐ আর্য প্রভুদের সেবায় প্রাণ ঢেলে দেবে। ঐ চন্ডালিকার "সীতে" (ফিনফিনে একটা কমলা রং এর শাড়ী পরে,  রামের পেছনে আর ভাই লক্ষণের সামনে  দুঃখী  দুঃখী মুখে typical slow motion এ হাঁটা), রাম ভক্ত হনুমান, আর বিভীষণ মার্কা কিছু রাক্ষস যেমন মহান হয়েছিল আর কি! অতীত আর আগুনে-চলা সীতার জামানার ঐ রাম রাজত্ব নাকি ফিরে আসবে। আহা, মামার বাড়ী আর কি!

এসব কিন্তু মাত্র গত পাঁচ বা ছয় বছরে হয় নি। ভারত স্বাধীন হবার পর থেকেই প্রায় শুরু হয়েছিল রোগটা- "সেকুলারিসম" এর আড়ালে। ডিসেম্বর  ১৯৯২ তে প্রথম ডাক্তারের কাছে যাবার পরামর্শ আসে। এখন, গত কয়েক বছর হল গুটি বসন্তের দাগগুলো বেড়োতে শুরু করেছে। তাতেও অবশ্য় অধিকাংশ "হিন্দুর" আহ্লাদ আর দিবাস্বপ্ন কমার বদলে তা বেড়েই চলেছে।  দেশে থাকাগুলোর তো বটেই, বিদেশে থাকা গুলোও খুব একটা পিছিয়ে নেই।

নাচ শেষ হলে আশাকরি সবাই বুঝতে পারবে ঐ মেয়েগুলোর হাতে রঙ্গীন কাগজ চেটান দুটো শুকনো লাঠিই থাকল। হাতে শুকনো বোঁদের একটা লাড্ডু, রোশোগোল্লা নয়, থাকলেও থাকতে পারে। উপরে তাকালে দেখতে পাবে ঐ  লেজকাটা বাঁদরগুলো গাছের ডালে বসে কেমল মজা দেখল। বেশ কেমন রসিয়ে রসিয়ে খ্য়া খ্যা করে হাসছে। যাক্, নাচা তবে সার্থক!  

এত দুর লিখে ছিলাম। ভাবছিলাম এবার শেষ করব। তা পাশ থেকে একজন বলে উঠল- "কি করবি? কে আঁটকাতে পারবে।"

ওরাই, ঐ মেয়েগুলোই পারবে। ওদেরই পারতে হবে। তার সঙ্গে কিছু টিমটিম করে টিকে থাকা গুটি কয়েক ভদ্রলোক হয়তো যোগ দেবে। অবশ্য ওসব আশা না করাই ভাল। ওরা না পারলে, ঐ মেয়েগুলোর মত অগুন্তি মেয়েদের আর ভারতের অন্য় সবাই কেই ঐ অধঃপতন সহ্য করতে হবে। প্রথম প্রথম  হয়ত ভাল লাগবে। ক্রমশ গলায় ফাঁস হয়ে বসতে থাকবে।

কেও কেও হয়ত নিজের যোগ্যতায়, বা ঘুষঘাস দিয়ে, বা অন্য কোন ধান্দাবাজী করে, বা সোজাসুজি illegally কোনো সভ্য দেশে থাকার সুযোগ পাবে। অধিকাংশই সেটা পাবে না, বা পারবে না। তাদের তখন ঐ “দেশপ্রেমিক”  হতে হবে। আর আজকাল দেশ মানেই তো- হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্থান।

এভাবে চললে আজ থেকে দশ বা কুড়ি বছব পর  মনে হতেই পারে- "এর থেকে মরে যাওয়া ও ভালো"! কিন্তু তার বদলে ওরা ঐ পুজো আচ্চা আর আর্য সেবা আরও বাড়িয়ে দেবে মনে হয়- ঐ “সাধারন” থেকে “আসাধারন” হওয়ার  বা “আর্য” হওয়ার,  বা "আমরা" থেকে "ওরা" হওয়ার সাধনায়! মোক্ষ আর সগ্গ সঙ্গে BOGO  (Buy One Get One) offer  এর মত  free! ইহজন্ম সার্থক হলে পরজন্মে কোনো মামু, বা কোই-মাই-কা-লাল, হাত লাগাতে পারবে না।  গণেশ তো কোন ছাড়, ব্রক্ষা- বিষ্ণু-মহেশ্বরও চোখ গোলগোল করে ঘাবড়েই থাকবে।  তখন  সোজা হার্তিক রোশনের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডে থাকা আর মাঝেমাঝে বরফে নেংটি পরে উদ্দাম নেত্ত। তান্ডব আর কি।  হিন্দি, হিন্দু,  হিন্দুস্থান গ্য়ায়া তেল লেনে। 



Short URL- https://is.gd/iInj4d 

No comments:

Post a Comment

Please do not post any advertisement or link thereof

Note: Only a member of this blog may post a comment.