Thursday, October 15, 2015

পুজোর গল্প (১৪২২)- গোপীনাথরা আজকাল আর বোর হয় না



পুজোর গল্প (১৪২২)
  

সত্যি মিথ্যে জানি না, তবে গল্পটা ভাল বেশ কিছুদিন আগে বিশ্বজোড়া (মায়া(জালের দৌলতে আমার বুদ্ধিমান দূরভাস যন্ত্রে এটা পেলাম শুদ্ধ এবং সম্মানিয় বাংরেজি ভাষায় বললে, internet এর দৌলতে আমার smart-phone পেলাম  আমি অবশ্য গল্পটা বলার জন্য এটা লিখতে শুরু করি নি এ বোর কিন্ত সে ইংরেজি 'বোর', অর্থাৎ বরাহের একঘেয়ে বিরক্তি নয়। এটা আবার দাবার বোড়ে বা বোরো চাষের গল্পও নয়। আপাতত্, বোরেকে বোরের মত থাকতে দাও। যথা সময়ে, বয়স আরও দশ মিনিট বাড়লে, সব জানতে পারবে।

আসল গল্পে যাবার আগে internet পাওয়া গল্পটা সংক্ষিপ্তাকারে বিস্তারিত বলে নেওয়া যাক।

এক বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় প্রশ্নটা এসেছিল। একটি ব্যারোমিটারের সাহায্যে কিভাবে একটি গগণচুম্বী বহুতল ভবনের উচ্চতা নির্ণয় করা যায়- বর্ণনা কর।

একজন ছাত্র উত্তর দিল- ব্যারোমিটারের মাথায় একটা দড়ি বাঁধতে হবে। এরপর ব্যারোমিটারটিকে ভবনের ছাদ থেকে নীচে মাটি পর্যন্ত নামাতে হবে। তাহলে ব্যারোমিটারের দৈর্ঘ্য আর দড়ির দৈর্ঘ্য যোগ করলেই ভবনের উচ্চতা পাওয়া যাবে।

এরকম সোজাসাপ্টা উত্তর অসীম জ্ঞানী প্রফেসর এবং পরীক্ষককে এমন রাগিয়ে দিল যে তিনি ততক্ষণাত ছাত্রটিকে ফেল করিয়ে দিলেন। ছাত্রটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আবেদন করলে বিশ্ববিদ্যালয় একজন নিরপেক্ষ বিচারক নিয়োগ করলো ব্যাপারটা মীমাংসা করার জন্য।

বিচারক দেখলেন, উত্তরটি সম্পূর্ণ ঠিক, কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের কোন উল্লেখযোগ্য জ্ঞান উত্তটির মাঝে অনুপস্থিত। তাই তিনি ব্যাপারটির মীমাংসা করার জন্য ঠিক করলেন, ছাত্রটিকে ডাকবেন এবং তাকে ছয় মিনিট সময় দেবেন। এই ছয় মিনিটের মধ্যে ছাত্রটিকে মৌখিকভাবে প্রশ্নটির এমন উত্তর দিতে হবে যার সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক নীতিগুলির নূন্যতম সম্পর্ক আছে।

ছাত্র এল। এসে চুপচাপ পাঁচ মিনিট ধরে কপাল কুচকে বসে চিন্তা করতে লাগল। বিচারক তাকে সতর্ক করে দিলেন যে তার সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। ছাত্রটি বলল, তার কাছে কয়েকটি যথাযোগ্য উত্তর আছে, কিন্তু সে ঠিক করতে পারছে না কোনটা সে বলবে। বিচারক তাকে তাড়াতাড়ি করতে বললে ছাত্রটি যে উত্তরগুলো দিল-

প্রথমত আপনি ব্যারোমিটারটা নিয়ে ছাদে উঠবেন, এরপর ছাদের সীমানা থেকে ব্যারোমিটারটা ছেড়ে দেবেন এবং হিসাব করবেন মাটিতে পড়তে ব্যারোমিটারটির কতটুকু সময় লাগল। এরপর h=(0.5)*g*t2 সূত্রটির সাহায্যে আপনি ভবনের উচ্চতা মেপে ফেলতে পারবেন। কিন্তু এতে ব্যারোমিটারটার দফারফা হয়ে যাবে।

অথবা যদি রোদ থাকে তাহলে ব্যারোমিটারটার দৈঘ্য মাপবেন। এরপর ব্যারোমিটারটাকে দাঁড় করিয়ে এর ছায়ার দৈঘ্য মাপবেন। এরপর ভবনের ছায়ার দৈঘ্য মাপবেন। এরপর অনুপাতের ধারণা ব্যাবহার করে কিছুটা হিসাব কষলেই ভবনের উচ্চতা পেয়ে যাবেন।

কিন্তু আপনি যদি ব্যাপারে বাড়াবাড়ি রকমের বিজ্ঞানমুখী হতে চান তাহলে আপনি ব্যারোমিটারের মাথায় ছোট একটা সুতা বেঁধে প্রথমে মাটিতে তারপরে ভবনের ছাদে পেন্ডুলামের মত দোলাবেন এইক্ষেত্রে অভিকর্ষ বলের সংরক্ষণশীলতার কারণে T=2*π2*(l/g) সূত্র থেকে ভবনের উচ্চতা বের করতে পারবেন।

অথবা যদি ভবনটির কোন বহিঃস্থ জরুরী নির্গমন (শুদ্ধ বাংলায় বললে- emergency exit) সিঁড়ি থাকে, তাহলে আপনি সেখান বেয়ে ব্যারোমিটারের দৈঘ্য অনুযায়ী ব্যারোমিটার দিয়ে মেপে মেপে ভবনের উচ্চতা বের করে ফেলতে পারেন।

আর আপনি যদি একান্তই প্রথাগত এবং বিরক্তিকর পথ অনুসরণ করতে চান তাহলে, প্রথমে ব্যারোমিটারটা দিয়ে ছাদের উপর বায়ুচাপ এবং পরে মাটিতে বায়ুচাপ মাপবেন। এরপর বায়ুচাপের পার্থক্যকে মিলিবার থেকে ফিটে বা মিটারে পরিনত করলেই ভবনের উচ্চতা পেয়ে যাবেন।

কিন্তু, নিঃসন্দেহে, সবচেয়ে ভাল পদ্ধতি হবে ভবনের রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্বপালন করে যে তার কাছে যাওয়া এবং তাকে বলা, “যদি আপনি একটি সুন্দর নতুন ব্যারোমিটার পেতে চান, তাহলে আপনাকে বলতে হবে এই বহুতল  ভবনটির উচ্চতা কত!

এবার আসল গল্প শুরু করা যাক্।
বিদেশি ছাত্রের জায়গায় ভারতের বা বাংলার গোপীনাথ থাকলে এবং একই উত্তর দিলে কি হত?

প্রথমে গোপীনাথ সম্পর্কে বলা উচিত। আমাদের গোপীনাথ নিশ্চীন্দপুরে থাকে আর গোবিন্দপুরের সরকারি মহাবিদ্যালয়ে পড়ে। গোবিন্দপুর মফস্বল শহর হলেও নিশ্চীন্দপুরকে গ্রাম বলাই ভাল। গোপীনাথের বাবা তিনকড়ি ওখানকার সকলের পরিচিত ডাক্তারবাবু। ঐ গ্রামের ডাক্তার আর কি। পয়সা বা দাপট কোনটাই তেমন নেই, যদিও তখনকার দিনে দেশের সেরা কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা। তবে লোকে ভক্তিশ্রদ্ধা, মান্যগন্নি করে। টাকা পয়সার থেকে চাষের ধান, পুকুরের মাছ, জমির কুমড়ো ইত্যাদি বেশি দেয় চুন-পান-মিষ্টি আর বিছুটিমূল পার্টির মধ্যে ঝামেলা, বা, গ্রামের মাতব্বররা নিজেদের বিশ্বাস করতে না পারলে বা একমত না হতে পারলে তিনকড়ি ডাক্তারের ডাক পরে। তাই তিনি গ্রামের মন্দির পূনর্গঠন কমিটির কোষাধ্যক্ষ।

তা তিনকড়ি সাধ্যের প্রায় বাইরে গিয়ে ছেলেকে কাছের ঝিকড্ডে হাইস্কুলের বদলে শহরের মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে রাজি হয়েছিল নানা কারণেতারমধ্যে বৌয়ের কথা, না, ছেলের ভবিষ্যত কোনটা বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল এখন আর সেটা কারুর মনে নেই। তবে তার জন্য তিনকড়ির অনেক খরচ হয়েছে। তিন তিনটে প্রাইভেট টিউসন (অবশ্য তাতে গোপীনাথের তেমন কিছু হাতি ঘোড়া উন্নতি যে হয়নি, তা বলাই বাহুল্য) বিমলদার কোচিং আলাদাওখানে নাকি সাজেসন খুব ভাল পাওয়া যায়। তবে টাকাটা একটু নয়, বেশ অনেকটাই বেশি নেয়। তা, ভাল জিনিষের তো দাম বেশিই হবে। শুধু সম্ভবনার ওপর ভিত্তি করে কেও অত পয়সা দেয় না। ঝুনঝুনওয়ালা কোচিং আরও ভাল। তবে পয়সা আরও বেশি। সরস্বতী, অর্থাৎ  গোপীনাথের মা, তার বরকে আর বেশি চাপাচাপি করে নি। কে জানে কখন মতি বিগড়য় আর এগুলোও না বন্ধ  করে দেয়।

এখানেই শেষ নয়। গোবিন্দপুরে সরকারি মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি করান বেশ ঝকমারির কাজ। অনেক টাকা তো গেছেই, তার ওপর নানান্ ওচাঁ, মনুষ্যেতর” (তিনকড়ির ভাষায়) লোকজনদের অনুনয় বিনয় করতে হয়েছে। ওটা তিনকড়ির আত্মসম্মানে অনেক বেশি আঘাত দিয়েছে। নানা লোক, পার্টির দাদা, এমনকি ওখানকার পদার্থবিদ্যার অপদার্থ অধ্যাপক, বিমান রাযচৌধুরিকেও দিতে হয়েছে।

বছর দশেক আগে ইংল্যান্ড ফেরত পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক বিমান রায়চৌধুরি (HS, BSc, MSc, MPhil., PhD, FNA, FASc, PMP, MBA etc. etc.) শিক্ষক বা মাস্টারমশাই কথাগুলোকে একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। তার পছন্দ প্রফেসর। তবে, অধ্যাপক বললে কিছু বলেন না। উনি আগে চুন-পান-মিষ্টি পার্টির কর্মাধ্যক্ষ ছিলেন। তার জোরেই নাকি চাকরি। ওনার বাবা-কাকারা ভারত ভাগ হবার পর পূর্বপাকিস্থান থেকে এসে কলকাতায় চুন-পান-মিষ্টি পার্টি করে সরকারি চাকরির উচুঁ পদে ওঠার সুবাদে অনেক পয়সা আর প্রভাব অধ্যাপক রায়চৌধুরির বিদেশে উচ্চশিক্ষা আর দেশে ফিরে সরকারি চাকরি পাবার অন্যতম কারণ।

অধ্যাপক রায়চৌধুরি নাকি কলকাতার এক বিখ্যাত কলেজে পড়বার সময় নকশাল আন্দোলনে একটু বেশিই আন্দোলিত হয়ে পড়েছিলেনআর অন্যান্য বুদ্ধিমান গরীব-দরদী দেশপ্রমী নকশাল ছাত্রনেতাদের মত উনিও চিন বা রাশিয়া ছেড়ে, আমেরিকাতেই পড়তে এবং থাকতে গেছিলেন। কপাল খারাপ। তাই ওখানে চাকরি না পাবার পর দেশপ্রেম ও সমাজতন্ত্রের মাহাত্য পুণরায় বুঝতে দেশে প্রত্যাবর্তন। তা চেষ্টা করলে কি একটা কাজ-চলা গোছের চাকরি পেওয়া যেত না? দেশে ফিরে কিছু একটা ডাক্তার, ইজ্ঞিনিয়ার, ম্যানেজার,  নিদেনপক্ষে আইটি বা সায়ন্টিস্ট বললে কেও কিছু সন্দেহ করত না। ওরকম তো কতই হচ্ছে। অনেক বাংলা শব্দের মত, বৈজ্ঞানিক কথাটাও ঠিক ওজনদার নয়, বলে মন ভরে না, আর লোকেও বলে না। তাই সায়ন্টিস্টই বললাম।

চুন-পান-মিষ্টি পার্টির দাপুটে নেতা, কলকাতার লেখক-ভবনে উচ্চপদে আসীন সরকারী আধিকারিকের ছেলে, বাড়ীতে জনা পাঁচেক চাকর-বাকর-রাঁধুনি-ড্রাইভার, সারাক্ষণ মোসাহেব পরিবেষ্টিত থাকা; আর, আমেরিকার সাম্যের চোটে আর পাঁচটা সাধারণ লোকের মত থাকা কি এক হলো? তা অবশ্য ওখানকার বঙ্গসমিতি মার্কা দেশীয় সংগঠনগুলোর অনুষ্ঠান আর আড্ডাগুলোতে কিছু মোসাহেব সবসময় জুটে যেত। কিন্তু, দুধের স্বাধ কি ঘোলে মেটে? অনেকের মিটলেও, আমাদের একদা নকশাল করা, উচ্চবংশের সাম্যবাদী বঙ্গসন্তানটির মেটে নি।

এর মধ্যে বেশ কিছু অবশ্য নিল্দুকের রটনাও বলে অনেকে। তবে, আরও সব করিৎকর্মা মহান বিদ্দজ্জনদের মত ইনিও সরকার পরিবর্তনের পর এখন সব তন্ত্রটন্ত্র ছেড়ে বিছুটিমূল পার্টির জেলা সভাপতিআড়ালে অনেকে ওনাকে সভা-পত্লিও বলেতা আড়ালে নিন্দুক তো ছেড়ে দিলাম, অনেক নিজের লোকই তো কত কিছু বলে। সে সব ভাবার সময় বা দরকার এসব কর্মবীর লোকের থাকে না। অধ্যাপক রায়চৌধুরিও নেই।

তবে বাবারও বাবা থাকে। সেই সব দাদুর নাতিদের জায়গা করে দিতে, আর চুন-মূল, তথা চুমূল পরিবর্তনের জন্য এই ধ্যাড়ধ্যাড়ে গোবিন্দপুরে পড়ে থাকা। নয়তো অধ্যাপক রায়চৌধুরির মত প্রতিভাদের কলকাতার নামী কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়েই মানায় বেশি। ওখানেই ওনারা বেশি শোভা পান। যাইহোক, ওনার কথা যথা সময়ে আবার বলা যাবে।

গোপীনাথ নিজে স্থানীয় ঝেকড্ডে সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে পড়তে ইচ্ছুক। তার প্রায় সব বন্ধুরাই ওখানে পড়বে- অবশ্য যে কজনের বাবা-মা পড়াতে পারবে। তিনকড়িরও তাতে সায় ছিল। কিন্ত সরস্বতী বেঁকে বসে। ওখানে পড়লে নাকি ইহকাল আর পরকাল দুটোই ঝড়ঝড়ে হয়ে যাবেগোবিন্দপুরে সরকারি মহাবিদ্যালয়ে কত বড় বড় সব অধ্যাপক। বিলেত ফেরতও বেশ কিছু আছে। সবথেকে বড় কথা- কলকাতার বিখ্যাত লোক ঝুনঝুনওয়ালারা ঐ মহাবিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত। ওদেরইত কত বড় বড় সব কোচিং স্কুল। ওদের ওখান থেকে পড়লে ডাক্তারি, ইজ্ঞিনিয়ারিং, IIT, IIM, AIIMS প্রভৃতি নামিদামি জায়গায় ভর্তি; Tata, Infosys, IAS, IPS আরও সব কত বড় বড় জায়গায় চাকরীর সম্ভবনা। তার থেকেও বড় কথা, বিদেশ যেতে পারবে। আর তা নাও যদি হয়, নিদেন পক্ষে কলকাতা, দুর্গাপুর, বাঁকুড়া, সিউড়ীর মত বড় শহরে চাকরি তো প্রায় পাকা। ঝুনঝুনওয়ালাদেরই তো ওসব জায়গায় কত অফিস, কত ফ্যাক্টরি, রমরমা কারবার!

তার ওপর সমাজে, পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় বন্ধু মহলে সম্মান বলেও তো একটা ব্যাপার আছে, নাকি? সরস্বতীর অবশ্য কলকাতার নামিদামি কলেজই বেশি পচ্ছন্দ। তবে তার ঝক্কি আর খরচ দুইই বেশি। তা কিনা, এসব ভুলে গিয়ে গুপীকে ঐ ঝড়ঝড়ে ঝেকড্ডেতে পাঠানো আর নিজের হাতে খুন করার মধ্যে তফাৎ তেমন কিছুই নেই।

যাইহোক, অনেক যুদ্ধ বিগ্রহ, অহিংস এবং অসহযোগ আন্দোলনের পর গোপীনাথের গোবিন্দপুরে সরকারি মহাবিদ্যালয়ে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি এবং ওখানকার মহান শিক্ষক, থুরি অধ্যাপকদের, তত্বাবধানে শিক্ষালাভ শুরু হল

মাধ্যমিক পাশ করে গোপীনাথের হঠাৎ কলা বিভাগে সাহিত্য আর অর্থনীতি (ইকনমিক্স) নিয়ে পড়তে ইচ্ছা হয়। তা বিজ্ঞান আর কলার দ্বন্দে কলাকে কলা দেখিয়ে তিনকড়ির ডাক্তার-ইজ্ঞিনিয়ার-বৈজ্ঞানিক; আর সরস্বতীর টাটা-ইনফোসিস-IAS-IPS-বিদেশযাত্রার জয়লাভের কাহিনী বিস্তারিতভাবে বর্ণনা না করলেও পাঠকদের তা বুঝতে বেশি বেগ পেতে হবে না বলেই মনে হয়। তার ওপর, যা একগুঁয়ে ছেলে বাবা! বেশি কিছু বললে আবার কিছু করে না বসেতা বিদেশ যাত্রার ব্যাপারটা অবশ্য তিনকড়িরও পছন্দ। আজকাল তো ব্যাংকক, দুবাই বা চিন গেলেই এখানকার লোকেদের মাটিতে ঠিক করে পা পড়ে না। আমেরিকা বা পশ্চিম ইউরোপে উচ্চশিক্ষা আর কাজ করা তো এখানে নোবেল পাবার সমান, ভাল ছেলে হবার সর্বসম্মত ISI বা ISO 9004 মানদন্ড। তখন গর্বে বুক ফুলে গেলে ২৬ সাইজের গেজ্ঞিটা পাল্টে ৩২ কিনতে হবে অবশ্য

তা গোপীনাথ কলেজ থেকে ফিরে মাকে ওর ফিজিক্সে ফেল করার খবর দেবার পর-

গোপীনাথের মা সরস্বতী:
হ্যাঁরে গুপি, পরীক্ষাটার আগে খেলাটা একটু কম করলেই পারতিস বাবা। তোর বাবা কত করে তোকে বলল। একটু ওর কথাটা শুনলে আজ এ দিন আসত না। তুই কিনা ফেল করলি? তাও আবার ফিজিক্সে! তোর বাবা অনেক চেষ্টা করছে তোর মাস্টারকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করিয়ে তোকে আর একটা সুযোগ দিতে। তার জন্য অনেক টাকা খরচ হবে বলছিল। আর ঐ রকম করিস না। বুঝিসইত আমাদের বয়স হচ্ছে। তুই না দেখলে কে আমাদের বুড়ো বয়সে দেখবে?

পাশের বাড়ীর সুনুকে দেখ। বাড়ীতে যতক্ষন থাকে সারাদিন পড়াশুনো করে। তার মধ্যেই কুমোনো না কামানো কি বলে, সেটা; তারপর তাইকোন্ড না লন্ডভন্ড সেটা, তারপর সাঁতার, তারপর গিটার আর গান। বাড়ীর কোন কাজে সাহাজ্য না করে, বা, এদিক ওদিক হাঁ করে তাকিয়ে, ডাংগুলি খেলে তোর মত সময় নষ্ট করে না। কি ভাল ছেলে!

আর তুই? সারাদিন টোঁ টোঁ করে ঘুরে বেরান কখনও কারুর বাড়ীর পাঁচিলে, আবার পরক্ষনেই  আম গাছে। কখনও গরুর পেছনে, তো কখনও গাধার পিঠে। জলে মাছ, কাদায় ব্যাঙ, আকাশে পাখি দেখে কোন পড়ুয়া ছেলে ওভাবে সময় নষ্ট করে? পরীক্ষার আগের দিন কোন আক্কেলে তুই নদীতে তিন ঘন্টা সাঁতার কেটে, ঐ বখাটে নীচুপট্টীর ছেলেগুলোর সঙ্গে  টোঁ টোঁ করে ঘুরে এলি? তোর বাবার রাগ হওয়া কি খুব অসঙ্গত? তোর জন্য আমাদের কত কথা শুনতে হয় জানিস? শুধু কি পাড়ার লোক? আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব সবার কাছ থেকে তোর সম্বন্ধে শুনতে হয়। ঐ নীচুপট্টীর ছেলেওগুলোর সঙ্গে না মিশে সুনুর মত ছেলেদের সঙ্গে মিশলে তোর কত ভাল হবে সেটা বোঝার বয়স তোর যথেষ্ঠ হয়েছে। মাঝেমাঝে মনে হয় ভগবান তুমি আমাদের কপালেই এই সৃষ্টিছাড়া, দুরন্ত জেদি ছেলে দিলে!

অনেক হয়েছে। এবার কিছু খেয়ে দয়া করে পড়তে বসো- বাবা আসার আগে। আর কতদিক সামলাব? এবার পাগল হয়ে যাব।

এর কিছুদিন পর কলেজে, অধ্যাপক বিমান রায়চৌধুরি:
তোমার বাবা কত মানীগুণী লোক। অত করে বললেন তাই কথাটা ফেলতে পারলাম না। তোমার মত অমনযোগী, কথা না শুনতে চাওয়া ছেলেদের আমি এক্কেবারেই দু চোখে দেখতে পারি না। ঐ উত্তরটা তুমি কোন আক্কেলে লিখলে? আমি কি তোমাদের ক্লাসের নোটে ওটা বলেছিলাম? যত্তসব!

তোমার বয়সে আমরা ওসব ঘুড়ি উড়িয়ে বা ফুটবল খেলে সময় নষ্ট করি নিএই যে আজ এসব সম্মান, প্রভাব প্রতিপত্তি দেখছ তা তিলতিল করে, বিদ্যে বুদ্ধি দিয়ে, খেটে মেহনত করে তৈরী করতে হয়েছে। আমি তখন দিনে কুড়ি ঘন্টা করে পড়তাম। বড়রা যা বলতেন সব মন দিয়ে শুনতাম। কখনও তাদের মুখের ওপর কথা বলা তো দুরের কথা, ভাল করে তাদের চোখের দিকেও তাকাতাম না। সেদিন তোমার এক বন্ধুকে- গাধা বুড়ো হলে ঘোড়া হয় না, সম্মান নিতে জানতে হয়- টাইপের কি সব কথা বলছিলে মনে হল?

যাইহোক, কাজের কথায় আসি। তখনকার দিনেই আমার সব সাবজেক্টে দুটো করে প্রাইভেট টিউসন। তার সঙ্গে কেজরিওয়াল কোচিং। তোমাদের ঐ ঝুনঝুনওয়ালা কোচিং ওর কাছে নস্যি। তোমার তো আবার তাও নেই।

তোমার প্রতিবেশি সুনু না? ও তো আমর কাছে প্রাইভেট টিউসন নেয়ওর থেকে শিখতে পার। কখনও মুখের ওপর কথা বলে না। যা সাজেসন আর নোট দিই সেটাই অসাধারণ মুখস্থ করে পরীক্ষায় ওর নম্বর দেখেছ? বাংলা, ইংরেজি, ভূগোল, ইতিহাস তো ছেড়ে দাও; অঙ্ক বিজ্ঞানেও মুখস্থর কোনও বিকল্প নেইস্টার তো এখন পাস মার্ক। তুমি কি ভাবছ জয়েন্টে তুমি প্রশ্ন দেখার পর চিন্তা করে, ভেবে উত্তর দেবে? আবার, উত্তর শুধু ঠিক হলেই হবে না। তোমাকে জানতে হবে পরীক্ষকের কোন উত্তরটা চাই। তখন কেউ তোমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করবে না তুমি কি ভাব, কেন তা ভাব। তোমার মতে চললে একশতে তিরিশও পেতে হবে না। তাতে আড়াই হাজার ranking আর পুরুলিয়া ইজিনিয়ারিং কলেজ পেতে পারওতে দিল্লি, মুম্বই, খড়্গপুর, বা নিদেনপক্ষে আমাদের যাদবপুর, শিবপুর পাবে ভেবেছ?

যা হোক্, তোমার বাবার দিকে তাকিয়ে এবারের মত তোমাকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দিচ্ছি। আমি কমরেড, অধ্যাপক পালিতকে বলে দিয়েছি। উনি তোমার মৌখিক পরীক্ষা নেবেন। আমার আর তোমার বাবার মুখ ডুবিয়ো না।

(এখানে বলে রাখা ভাল কলেজের প্রধান, অধ্যাপক পালিতও আর কমরেড নেই। অন্য বুদ্ধিমান লোকেদের মত উনিও কমরেড ছেড়ে, বেশি-রেড হয়ে এখন বিছুটিমূল পার্টির নেতা। তা এত বছরের অভ্যেস, সহজে কি আর  যায়?)

আর একটা কথা। পরের সপ্তাহ থেকে আমার কাছে প্রাইভেট টিউসন এ চলে আসবে। রাত সাড়ে দশটা থেকে তোমাদের ব্যাচ শুরু হবে। সপ্তাহে দু দিন। তোমার বাবার সঙ্গে কথা হয়ে গেছে। আমার কথা শুনলে পরের পরীক্ষাগুলোয় নাইন্টি পারসেন্ট কোন ব্যাপার হবে না।

ও বাবা, দেড়টা বেজে গেছে দেখছি! বাড়ী যাই। টিউসনের এই ব্যাচের ছেলেগুলো চলে আসবে।

ওহ্, তোমার সাইকেল আছে দেখছিএকটা কাজ করো তো। তোমাদের পরের পিরিওডটাও হবে না। অধ্যাপক পালিত বাড়ীতে ব্যাস্ত। মেয়ে-জামাই এসেছে আমেরিকা থেকে। তুমি সাইকেলটা নিয়ে তোমাদের পাড়ার মণি স্যাকরার দোকান থেকে আমার গোমেদের আংটিটা নিয়ে আমার বাড়ী পৌঁছে দিয়ে পরের পিরিওডটা করতে পারবে। পরশু ওটা সারতে দিয়ে এসেছি, আজ দেবার কথাপেমেন্ট করে দেওয়া আছে।

গল্পটা শেষ করার আগে বলি-
প্রথমে বলা ইন্টারনেটে পাওয়া গল্পের ছাত্রটি ছিল নীলস্ বোর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কারজয়ী প্রথম ডেনিশ বিজ্ঞানীনাৎসিদের আদর সহ্য না করতে পেরে উনি দেশ ছেড়ে ব্রিটেনে থাকা শুরু করেছিলেন। পরে দেশে ফিরে আসেন। ওনার ছেলেও ডেনমার্ক থেকেই পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান- ব্রিটেন বা আমেরিকা থেকে নয়।

গোপীনাথের বাবা, বিশ্ববিদ্যালয়ের আ্যডমিনিশট্রেশন আর পরীক্ষা বিভাগের বিজ্ঞজনেরা, দ্বিতীয় পরীক্ষা নেবার পর অধ্যাপক পালিতের প্রতিক্রিয়া, সমাজের বিদ্দজ্জনেরা, পাড়ার সুনুদার মা প্রভৃতির কথা বলার ইচ্ছে ছিল। আরও বেশ কিছু লোকের কথা বলা উচিৎ যারা নিজেদের ছেলেদের উচ্ছন্ন যাওয়া সহ্য করতে পারে, কিন্ত ডাক্তারবাবুর ছেলেকে আম গাছে দেখলে অতীব উদ্বীঘ্ন এবং প্রচন্ড চিন্তিত হয়ে পরতেন। ওদের কথা না হয় পরের বার বলব।

আর গোপীনাথ? যারা ভারতের বা পশ্ছিমবাংলার সমাজ এবং ওখানকার (অ)শিক্ষা ব্যাবস্থা সম্পর্কে জানে তাদের গোপীনাথের ভবিষ্যত বুঝতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না।

ঝুনঝুনওয়ালা আর অধ্যাপক রায়চৌধুরিদের কল্যানে ডাক্তার, ইজ্ঞিনিয়ার, বৈজ্ঞানিক এবং আরও অনেক বিদেশে এক্সপোর্টেড এবং দেশে এক্সপোর্ট-কোয়ালিটি প্রতিভার দৌলতে দেশের শতকরা নিরানব্বই শতাংশ গোপীনাথদের অকালে পঞ্চত্তপ্রাপ্তি হয়। যাত্রা দলে পাঁচ টাকার চাকরিও আজকাল ওদের জোটে বলে মনে হয় না। নীলস বোর-রা আজকাল তাই বোর হয়ে নাকি সবাই পশ্চিমেই জন্মায়।

আর আমরা? হাতে পেনসিল নিয়ে ভাবি ওটা কোথায় ঢোকাববুদ্ধিজীবিরা ন্যাকামো, আঁতেলরা আঁতেলামো, আর আমরা, আম-জনতা, এক হাতে পেনসিল আর অন্য হাতে অন্যের ফেলে দেওয়া আমের আঁটি নিয়ে বর্তমানের দেওলিয়াপনা প্রকটভাবে উদযাপন করে কি আনন্দই না পাই! অতীতের সব বোর-দের নিয়ে, তাদের জন্মদিন পালনের নামে মাতলামো করার সুযোগ খুঁজি। গোপীনাথরা আমাদের সামনে মাঝেমাঝে হঠাৎ হঠাৎ উদয় হয়। মনে হয় যেন আমাদের চোখের সামনে আয়নাটা তুলে ধরে হাসছে।

না, গোপীনাথও নীলস বোর হয় নি। সব কি অবাস্তব হিন্দি সিনেমা তিনঠো বুরবক্”? ভুল দেশে, ভুল সময়ে জন্মানর খেসারত দিতে সে, লেহ্ বা লাদাখে নয়, নিশ্চীন্দপুরের গোপীনাথই থেকে গেছিল। স্থানীয় মাড়োয়াড়ীদের ধানকলে হিসেবের খাতা লিখে আর জেলুসিল খেয়ে, নিজের আর কিছু ক্রমশ অবলুপ্ত হতে বসা সরল, পূর্ণ স্বাক্ষর জেলায় অনেক নিরক্ষরের মধ্যে কিছু গরীব গুর্ব চাষাভূষোর ছেলেমেয়েকে অঙ্ক বিজ্ঞান ছাড়াও মানুষহবার সেই ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখাত।


না, গোপীনাথরা আজকাল আর বোর হয় না।


বি.দ্র: সব চরিত্র এবং দুঃশ্চরিত্রগুলো কাল্পনিক হলেও ঘটনাগুলোকে কাল্পনিক বলে উড়িয়ে দেওয়া বোধহয় ঠিক হবে না। আপনারা বিচক্ষন, বুদ্ধিমান। আশা করি ন্যায় বিচারই করবেন।

বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: এই গল্পটা লেখার জন্য দেশে বা বিদেশে থাকা কোন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বৈজ্ঞানিক, আইটি-ওয়ালা, প্রফেসর প্রভৃতিকে কোন ভাবে আঘাত করা হয় নি।